এগিয়ে চলার আনন্দে..............

এগিয়ে চলার আনন্দে..............

এগিয়ে চলার আনন্দে..............

মাঘ মাস নিয়ে আমাদের দেশে একটা প্রবাদ খুব প্রচলিত আছে, “মাঘের শীতকে নাকি বাঘেও ভয় পায়আবার শীত মানেই কুয়াশার চাদর, শিশির ভেজা মাঠের বুকে আদুল পায়ের স্পর্শ, হরেক  সব্জীর সমাহার, খেজুর রসের ঘ্রানে মাতোয়ারা, নতুন গুড়ে  পিঠে, রাত জেগে ঝরা পাতার গান। কিন্তু, শীতের এই ভিন্ন রূপটা সমাজের একটি স্তরে চিকাল রুপকথার গল্পের মতই থেকে যায়। তাদের কথাই বলছি, যাদের নিয়ে বলতে গেলে মানিক বন্দোপধ্যায়ের মতই বলতে হয়, “ যাদের ল্লীতে হয়ত ভগবান থাকেন নাকিংবা নচিকেতা চক্রবর্তীর সেই গানের ভাষায় “ যাদের ডাকে হয়ত ভগবান এই ধরণীতে আসেন না যাদের কাছে ষড়ঋতুর প্রতিটি বৈচিত্র্যের মাঝেই থাকেনা কোন ভিন্নতা, থাকে শুধু নতুন কোন যন্ত্রণার অপেক্ষা। সেই শীতার্ত মানুষগুলোর জন্যই গত ১০ মাঘ, ১৪২১ বঙ্গাব্দ ( ২৩ জানুয়ারি, ২০১৫) মাইক্রোবায়োলজি এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ ( এমএবি) এর পক্ষ থেকে আয়োজন করা হয় শীতার্তদের মাঝে শীতবস্ত্র বিতরনের। ২০১৩ সালে যাত্রা শুরু করে এই স্বল্প সময়ে যে সংগঠনটি করেছে বিভিন্ন পপ্রাতিষ্ঠানিক আয়োজন, এগিয়ে এসেছে বিভিন্ন প্রকার সামাজিক সহযোগিতামুলক কর্মকাণ্ডে। এই সংগঠনের একজন সদস্য হিসেবে আমি গর্বিত কারণ এমন কিছু আগ্রহী, প্রাণোদ্যমতা সম্পন্ন, কর্তব্যের প্রতি অগাধ নিষ্ঠাবান মানুষের সাথে আমার পথ চলা। আমি যদি আজ এই সংগঠনের অতীতের গল্পে নাও বা যাই শুধুমাত্র এই আয়োজনটি দিয়েও যাদের পরিচয় পাওয়া যায়।

গত ২০ জানুয়ারি ২০১৫ এমএবি এর মাননীয় সভাপতি জনাব ইমরানুল হক, পি এইচ ডি স্যার এর সভাপতিত্বে আয়োজন করা হয় একটি সভার।সেই স্বল্প সময়ের দিক নির্দেশনায় এবং সহযোগী সদস্য দীপংকর দেওয়ানজী এর সার্বিক তত্ত্বাবধানে মাত্র দিনে আমরা সকলে মিলে সম্পন্ন করি আমাদের এই ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা সবচেয়ে অবাক করেছে আমাক প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীগণ।মাত্র ১৫ দিন হল ওরা এই মাইক্রোবায়োলজি বিভাগে আর এটি ছিল সভায় ওদের প্রথম অংশগ্রহন।ওদের প্রাণোচ্ছলতা, আগ্রহ এতখানি ছিল আমি বলতে পারি কোন অলস পাথর ও চলতে চাইবে, মিশতে চাইবে এই প্রানের মেলায়।মাত্র ২ দিনে মাইক্রোবায়োলজি বিভাগ,চবি থেকে আমরা সংগ্রহ করি কয়েক হাজার শীত বস্ত্র।সবাই নিজের বাসা,আত্মীয়,বন্ধু,টিউশন,নিজের এলাকা যার থেকে পেড়েছে দেশের এই প্রতিকূল পরিস্থিতেও নিজের সরবোচ্চটুকু দিয়ে কাজ করেছে।২০ জানুয়ারি রাত ১০ টায় মাননীয় সভাপতি মহোদয় এবং অর্থ সম্পাদিকা তাসনিম চৌধুরী ম্যাডাম এর নেতৃত্বে শুরু হয় আমাদের বিতরণ কর্মসূচি।চট্টেশরী মোড় থেকে যাত্রা শুরু করে আন্দরকিল্লা,টেরি বাজার, লাল দিঘী হয়ে কোতোয়ালি শেষে ফিরিঙ্গি বাজার।তখনও অধিকাংশ কাপড়ই বাকি।ভ্যান নিয়ে পৌঁছে গেলাম এরপর অভয় মিত্র ঘাট।চারদিক শুনশান, কোথাও কোন সারা নেই নদীর ঘাটে।কিছুটা হতাশ মন নিয়ে যখনই ফিরব তখনই সেই আধার ভেঙে এক অপরিচিতর আগমন।বলা হয় ভাল কাজে সৃষ্টিকর্তাও সহযোগিতা করেন।সেই লোকটি এসে নিয়ে গেলেন কিছু ঘুমন্ত মানুষের ভিড়ে।প্রতিটি ঘুমন্ত মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে আরো গভীরভাবে অনুভব করতে পারলাম শীত কতখানি কষ্টের, কতখানি যন্ত্রণা থাকে এ রাতের প্রতি ক্ষনে যা নরম মখমলের চাদর কিংবা দামি জ্যাকেট, টুপি, হাত মোজা আর জুতোর আড়ালে বসে কখনো উপলব্ধি করার নয়সেখান থেকে রাত ২.৩০ টায় আমরা বের হই।তখনও অনেক কাপড় বাকী।স্যার এর নেতৃত্বে তখন আবার আমাদের নতুন পথচলা শুরু।রাত ৩ টায় এসে পৌঁছলাম মাদারবাড়ি।কিছুটা দূরে আগুন জ্বলতে দেখে সবাই মিলে এগোলাম সেই দিকটায়।নিজেরা অবাক হয়ে গেলাম।এই এতোটুকু জায়গাতে এতো মানুষের বাস হয়ত চোখেও পড়েনি কখনও কারো।কতটা বঞ্চিত তারা তার বর্ণনা উঠে আসলো তাঁদেরই একজনের কথায়।সেই রাত ৩ টায় মানুষগুলো ঠিকই গভীর ঘুম থেকে উঠলেন,হাত বাড়িয়ে দিলেন যদি সেই হাতে তার শরীরের প্রতিটি লোম সুচালো করে তোলা ঠান্ডা হাওয়ার বিরুদ্ধে একটু হলেও প্রতিরোধ গড়ার সম্বল পাওয়া যায়।যখন আমাদের সকল সংগ্রহ শেষ তখনও প্রায় হাজার খানেক বসতি বাকী।বুঝতে পারলাম কতখানি স্বল্প ছিল কিছুক্ষন আগেও বিশাল মনে হওয়া সংগ্রহকে।ভোর প্রায় ৬ টা।যখন ফিরছি তখন পা দুটো হঠাৎ জানান দিতে লাগলো তার উপরের দেহটা বইতে সে ক্লান্ত।কিন্তু,সারাটা রাতের একটি মুহূর্তও তৈরি হয়নি যেখানে ক্লান্তির কোন ছাপ ছিল কারো।তবুও, সকলের বুক ভরা আনন্দ ছিল, অসীম প্রাপ্তির উচ্ছ্বাস ছিল।রাস্তার পাশে শুয়ে যে বৃদ্ধটি মাথায় হাত বুলিয়ে দিল আমাদের কারো, কিংবা ছোট্ট সেই ছেলেটি যার নাম ছিল অসীম সেই ছেলেটি ওই মাঝরাতে ঘুম ভেঙে বাকিটা রাত আমাদের সাথে ঘুরলো তার নিষ্পাপ হাসিটা,মনে হল আজ সত্যিই জীবনে কিছু পেলাম।দুটো মানুষ আমাদের তাসনিম চৌধুরী ম্যাডাম এবং সহপাঠী পিংকি চৌধুরী।আমাদের সমাজে হাজার প্রতিকূলতায় বাধা থাকে নারীদের জীবন।তবুও সব প্রতিকূলতা অতিক্রম করে তাঁদের এই অংশগ্রহণে হাজার সাধুবাদ রইল তাঁদের প্রতি।

সবশেষ,কারো প্রতি ধন্যবাদ বা কৃতজ্ঞতা নয়, এমএবি এর প্রতিটি সদস্য তোমাদের প্রতি রইল জয় জয়কার।আমরা এই কজন মানুষ হাতে হাত রেখে যখন কিছু করতে পারি স্বপ্ন থাকুক দেশের বৃহৎ ক্ষেত্রেও একদিন আমরা সকলে হাতে হাত রেখে এগিয়ে যাব।সকলের এই একই মন্ত্রনা হোকআমার পাশে দেশ মানেই এক লোকের পাশে অন্য লোকএগিয়ে চলো সকলে,এগিয়ে চলুক এমএবি,অপেক্ষা রইল আবার এমন কোন আয়োজনের।

 

জয়তু মাইক্রোবায়োলজি এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ ( এমএবি )